শুভ নববর্ষ ১৪২৯!!! ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত এই বাংলা নববর্ষের দিন, আমার কাছে অনেক রূপে এসেছে। খুব ছোটবেলায় যখন অতশত বুঝতাম না, তখন আমার কাছে বাংলা নববর্ষ ছিল ভাল ভাল খাওয়ার দিন। বাড়িতে নানা রকমের রান্না হত। আর সন্ধেবেলা মিস্টি। সে সময় এলাকার দোকানগুলোতে হালখাতা হত বাংলা নববর্ষের দিনে। গুটি কয়েক দোকান ছিল যারা হালখাতা করত অক্ষয় তৃতীয়াতে। রামরাজাতলায় যেহেতু রাম ঠাকুর খুব জনপ্রিয়, অনেক দোকান রামনবমীর দিনে খাতা পুজো করত। আবার কিছু দোকান রথের দিনে নতুন খাতা খুলত।
মোটামুটি এই হালখাতার সৌজন্যে ছোটবেলায় নববর্ষের সন্ধেটা কাটত দোকানে দোকানে ঘুরে। সুন্দর সুন্দর ব্যাগে বাংলা নতুন বছরের ক্যালেন্ডার আর মিস্টির প্যাকেট থাকত। সেই ব্যাগের আকর্ষণে বাবার হাত ধরে ঘুরতে বেরোতাম। দিনের বেলা কাটত বাড়িতে, খাওয়াদাওয়া করে।
কলেজ জীবন পর্যন্ত নববর্ষ কাটত এই ভাবে। এই বয়স পর্যন্ত যা লেখালেখি করেছি, তার দৌলতে সাহিত্যের জগতে খুব একটা আনাগোনা ছিল না। অর্থাৎ কলেজ স্ট্রীটে যাতায়াত বিশেষ ছিল না। কর্মজগতে প্রবেশের পরে লেখালেখি একটু বাড়ে। তার সাথে বইপাড়ায় যাতায়াতও বাড়ে। তখন সাগ্রহে শুনতাম, বড় বড় প্রকাশকরা কেমন আড়ম্বরের সঙ্গে নববর্ষের আড্ডা বসায়। ফেসবুক তখনও খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি এবং অন্যান্য সামাজিক গণমাধ্যম যেমন মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপও মানুষের কাছে খুব একটা প্রিয় হয়ে ওঠেনি। মেসেজের এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না। নববর্ষ পালন হেতু অল্পবিস্তর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত হত।
সব মিলিয়ে নববর্ষ নিয়ে খুব একটা উন্মাদনা বা জাঁকজমক কোনটাই ছিল না। এখনও হয়ত তাই। বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে নববর্ষ এমন একটা ভিন্ন সুরে বাঁধা আছে, যে এই নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন দিনও ছিল না। অন্তত আমার চোখে সেরকম কিছু পড়েনি।
যত দিন ধরে লেখালেখি করছি, তার মধ্যে এক বছর, মনে আছে, বেশ পরিকল্পনা করে কলেজ স্ট্রীট বইপাড়ায় দিনের বেলা কাটিয়েছিলাম। সেবার সঙ্গে আমার স্ত্রীও ছিলেন। সেদিন সব ঘোরাঘুরির শেষে বাড়ি ফেরার আগে আদি মোহিনীমোহন বস্ত্রালয় থেকে স্ত্রীকে একটা শাড়িও কিনে দিয়েছিলাম।
আনন্দ পাবলিশার্সের কাউন্টারেও গিয়েছিলাম। আনন্দ পাবলিশার্সের কাউন্টারে তখন বই দেখছিলেন কবি পিনাকী ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন কবি শিবাশিস মুখোপাধ্যায়। বাড়িতে পিনাকী ঠাকুরের 'চুম্বনের ক্ষত' আমার সংগ্রহে ছিল। সে বইটি পড়েছি বহু বার। এর মধ্যে পিনাকী ঠাকুরের সঙ্গে কবিতা পাঠের আসরে কয়েক বার দেখা হয়েছে। তাছাড়া মানুষটি ছিলেনও খুব মিশুকে। বাস, জমে গেল তিনজনের। বেশ খানিকটা গল্পগুজবের পরে ছাড়াছাড়ি হল।
আনন্দ পাবলিশার্সের কাউন্টারে গিয়েছিলাম সন্ধে নাগাদ। তার আগে অবশ্য দুপুরে অনেকটা সময় ছিলাম পত্রভারতীর কলেজ রো কাউন্টারে। সেখানে তখন তারকার মেলা। কিন্নর রায় এসেছিলেন পাক্কা বাঙালির সাজে। পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবি। টেবিলে দু-তিন রকমের মিস্টির প্লেট। চুমকি চট্টোপাধ্যায় সবাইকে আপ্যায়ন করছেন। সে এক দারুণ দৃশ্য। আমি থাকতে থাকতে বিনোদ ঘোষাল এলেন। একটু পরে এলেন অনীশ দেব, হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এবং আরও অনেকে।
সত্যি কথা বলতে গেলে, অত তারকার মধ্যে নিজেকে কেমন অপ্রতিভ লাগছিল। সেটা অবশ্য মনে মনে। বাইরে থেকে কারও কিছু বোঝার উপায় নেই। ওই কলেজ রো-তে সে সময় কবি শ্যামলকান্তি দাশ এবং কবি শংকর চক্রবর্তীর আকর্ষণে প্রকাশনা সংস্থা 'পাঠক' -এর অফিসেও যাতায়াত ছিল। পত্র ভারতীর কাউন্টার থেকে বেরিয়ে পাঠক-এর অফিসে ঘুরে এলাম। সেখানেও তখন প্রচুর কবি-সাহিত্যিকের সমাবেশ।
মোটামুটি এই কয়েকটি মোলাকাত আমার বেশ মনে আছে। আরও কিছু কিছু প্রকাশকের অফিসে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, বলে রাখি। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স এবং দে'জ পাবলিশিং আমার কাছে বরাবর বেশ গুরুগম্ভীর স্থান বলে মনে হয়। এখনও আমি মনে মনে সেই ধারণা পোষণ করি। তাই ইচ্ছে থাকলেও ওই দুই জায়গায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
নববর্ষ নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে পুরানো কথা কিছু লিখে ফেললাম। বন্ধুরা ভাল থাকবেন। কথা হবে আবার। আমার এই ব্লগ সাইট আপনাদের ভাল লাগলে, আমার প্রচেষ্টা সার্থক।
