অনেক দিন হল ট্রেনে চড়ছি। দেখেছি অনেক কিছু। বহু বছর ধরে ট্রেন সফরের খুব সামান্য একটি ঘটনা নিয়ে লিখেছিলাম এই গল্প। প্রকাশিত হয়েছিল দ্বান্দ্বিক পত্রিকার ১৪২৭ উৎসব সংখ্যায়।
খাদ্য রূপে ঘুগনি বাঙালির কাছে সেরকম বিশেষ কিছু নয়। হ্যাঁ, হতে পারে খুব পছন্দের। তবে কৌলীন্যে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। অফিস টাইম বাদ দিলে অন্য সময় ঘুগনিওয়ালাদের দেখা মেলে। তবে লক্ষ্য করেছি, একটু পরিপাটি করে জামাকাপড় পরা বাবুদের এরা এড়িয়ে চলে। আমার ধারণা, এড়িয়ে চলে ব্যবসার কারণে। এই শ্রেণির যাত্রীদের মধ্যে ঘুগনি খাওয়ার প্রবণতা খুব বেশি থাকে না।
তাহলে কোথায় এই ঘুগনিওয়ালাদের বেশি দেখা যায়? এদের খুব বেশি দেখা যায় ভেন্ডর কামরায়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, কিছু ঘুগনি-বিক্রেতা আছেন যাঁরা ভেন্ডর কামরায় বেচাকেনা সেরে প্রয়োজনে কোন স্টেশনে নেমে যান। তারপর কিন্তু এদের অন্য কামরাতে, ঘুগনি বিক্রি করতে দেখা যায় না। তার থেকে এদের বরং বেশি পছন্দ পরের ট্রেনের ভেন্ডর কামরা।
এদের কেউ কেউ মুড়িতে মাখিয়ে ঘুগনি বেচে। সঙ্গে পেঁয়াজ, শসা কুচি, লংকার টুকরো আর সামান্য বিট লবণ। কখনও কখনও একটু পাতিলেবুর রসও ছড়িয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ শুধু ঘুগনি বেচেন। সঙ্গে কেউ চাইলে বাড়িয়ে দেন কোয়ার্টার পাউণ্ড পাঁউরুটি।
আমার গল্পে যে ঘুগনিওয়ালা রয়েছেন, তিনি বৃদ্ধ। ওপর এবং নীচের পাটির বেশ কয়েকটি দাঁত পড়ে গেছে। কথা বলতে গেলে দুই গালে টোল পড়ে যায়। অবশ্য তিনি কথাও কম বলেন। তাঁর আর একটি বিশেষত্ব আছে। তিনি সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরেন। কথা কম বলেন।
অফিস টাইমে হাওড়ামুখী ডাউন লোকালে ঘুগনির খদ্দের থাকে না। সেই সময়টা তিনি কামরায় বসে লোকজনের সঙ্গে তাস খেলে কাটান। তারপর ট্রেন হাওড়ায় পৌঁছালে তাঁকে বাদ দিয়ে সবাই নেমে যায়। তিনি আবার কোন এক আপ লোকালে উঠে ঘুগনি বিক্রি করেন।
করোনার পরে তাঁকে আমি অনেক দিন দেখিনি। তবে তাঁকে আমি ভুলিনি। এখনও আমার দৈনন্দিন ট্রেন যাত্রায় কখনও ঘুগনিওয়ালা চোখে পড়লে, তাঁর কথা মনে পড়ে যায়। ইচ্ছে করে জানতে, তিনি আছেন কেমন?
ট্রেনের সফর এক অদ্ভুত যাত্রা। এ যেন আগে থেকে ঠিক করা থাকে, সামান্য় একটু সময়ের জন্য় মানুষে মানুষে দেখা হবে। তারপর কে কোথায়, কারও কাছে তার খবর থাকবে না। কেউ যদি তাঁর খবর পান, জানাবেন আমাকে। আর অবশ্যই পড়বেন গল্পটি। আগামী দিনে নিশ্চয় আমার কোন গল্প সংকলনে গল্পটি গ্রন্থিত হবে। তখন জানাবো সে কথা। ভাল থাকবেন বন্ধুরা।

