Wednesday, April 20, 2022

বিতর্কিতঃ একটি গল্প এবং তার প্রেক্ষিত


লেখা চেয়ে ফেসবুকে দেওয়া কালি কলম ও ইজেল পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি প্রথম যখন দেখেছিলাম, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না। Paraphilia অর্থাৎ বিকৃত যৌনতা নিয়ে পত্রিকার সংখ্যা করবে, সম্পাদক আর তার সাথীদের সাহস তো নেহাত কম নয়। সন্দেহ জেগেছিল, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে লেখা পাবে তো? 

এবার নিজের লেখার কথা বলি। সংশয় ছিল, এমন বিষয় নিয়ে আমি কি একটি গল্প লিখতে পারব? তাও আবার বড় গল্প। শব্দসীমা বলা আছে ৩৫০০ - ৪০০০ শব্দ। ক'দিন ধরে ভাবলাম, ক্রমাগত ভেবেই চললাম। কিছু গবেষণাও করলাম। সম্ভবত পত্রিকা থেকে বিকৃত যৌনতার রকমফের নিয়ে একটি তালিকাও দিয়েছিল। হয়ত লেখকদের সুবিধার জন্যই তারা এটা করেছিল। সেই তালিকাটিও গবেষণার কাজে সাহায্য করেছিল।

সত্যি বলতে কি, কয়েক দিন ধরে বিষয়টাকে নিয়ে ভাবনা-চিন্তার পরে মনের মধ্যে একটি গল্পের রূপরেখা  ধীরে ধীরে জন্ম নিল। শুরু করে দিলাম লেখা। একটু এগোই, একটু থামি। ভাবতে থাকি,গল্পের সাহিত্য মান ঠিক থাকছে তো। একটু পদস্খলন হলেই কিন্তু বাজারি কোকশাস্ত্র বা পানু গল্পের মত না হয়ে যায়। 

কয়েক দিনের চেষ্টায় দাঁড়াল একটি গল্প। এখন মনে পড়ছে না, সম্ভবত সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলীর কারও সঙ্গে কথা হয়েছিল। জানতে চেয়েছিলাম, এই সংখ্যাটি ওরা সাজাবে কিভাবে? কথা বলে দেখলাম, ওরা খুব আত্মবিশ্বাসী। বলল, আমরা আমন্ত্রণী এবং প্রাপ্ত লেখা থেকে বাছাই করে, সব মিলিয়ে সাজাবো। আমন্ত্রণী লেখাগুলি সম্ভবত সবই ছিল প্রবন্ধ। বলেছিল, বেশ কিছু সাহিত্যিককে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে।

নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আমি লেখা পাঠিয়ে দিলাম। ওরা প্রাপ্তি স্বীকার করেছিল। এখন মনে পড়ছে, ওরা নির্বাচিত লেখার তালিকা প্রকাশ করতে দেখলাম তালিকায় আছে আমার লেখা। তখনও পর্যন্ত মনে একটাই চিন্তা, পাঠকের ফিডব্যাক কেমন হবে! 

এবার যেটা হল, পত্রিকা প্রকাশ পিছিয়ে গেল। আমি খবর নিয়েছিলাম, ওরা জানাল, মূলত আমন্ত্রণী লেখা পেতে দেরি হওয়ার কারণে ওরা পত্রিকা প্রকাশ পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। করোনার আগে পত্রিকা প্রকাশ হল না। তারপর তো করোনার কারণে লেখার জগতে টানা দুই বছর ছন্দ বিনাশ।  এবার বইমেলার আগে ওরা ইমেল করে জানাল, পত্রিকা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হতে চলেছে।

তারপর তো বইমেলা এলো এবং চলেও গেল। এত দিন ধরে এত লেখা লিখেছি, এই লেখাটি ছাপার অক্ষরে দেখার বিশেষ ইচ্ছে ছিল। তার কারণ অন্য কিছু নয়। গল্পের মধ্যে বিকৃত যৌনতা, নিতান্ত সূক্ষ্ণ এবং সাবধানতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। অবশেষে, কলেজ স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত ছোট পত্রিকা মেলায় ওদের স্টল থেকে সংগ্রহ করলাম পত্রিকা। তারপর বাড়ি ফিরে পর দিন সকালে গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম আমার গল্প।  এবার আপনাদের থেকে জানা বাক, কেমন পড়লেন আমার এই গল্প।

কলেজ স্কোয়ারে পত্রিকা সংগ্রহ করতে গিয়ে পরিচয় হল পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে। শুনলাম, এবার কলকাতা বইমেলায় নাকি পত্রিকাটি প্রচুর বিক্রি হয়েছে। খবরটা দারুণ উপভোগ করলাম। গল্পের প্রেক্ষিত নিয়ে এবার নিজের ব্লগে লিখলাম। এবার আপনাদের বলার পালা, কেমন পড়লেন আমার গল্প!

ভাল থাকবেন সবাই। আবার কথা হবে।

Friday, April 15, 2022

শুভ নববর্ষ ১৪২৯!



শুভ নববর্ষ ১৪২৯!!! ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত এই বাংলা নববর্ষের দিন, আমার কাছে অনেক রূপে এসেছে। খুব ছোটবেলায় যখন অতশত বুঝতাম না, তখন আমার কাছে বাংলা নববর্ষ ছিল ভাল ভাল খাওয়ার দিন। বাড়িতে নানা রকমের রান্না হত। আর সন্ধেবেলা মিস্টি। সে সময় এলাকার দোকানগুলোতে হালখাতা হত বাংলা নববর্ষের দিনে। গুটি কয়েক দোকান ছিল যারা হালখাতা করত অক্ষয় তৃতীয়াতে। রামরাজাতলায় যেহেতু রাম ঠাকুর খুব জনপ্রিয়, অনেক দোকান রামনবমীর দিনে খাতা পুজো করত। আবার কিছু দোকান রথের দিনে নতুন খাতা খুলত।

মোটামুটি এই হালখাতার সৌজন্যে ছোটবেলায় নববর্ষের সন্ধেটা কাটত দোকানে দোকানে ঘুরে। সুন্দর সুন্দর ব্যাগে বাংলা নতুন বছরের ক্যালেন্ডার আর মিস্টির প্যাকেট থাকত।  সেই ব্যাগের আকর্ষণে বাবার হাত ধরে ঘুরতে বেরোতাম। দিনের বেলা কাটত বাড়িতে, খাওয়াদাওয়া করে।

কলেজ জীবন পর্যন্ত নববর্ষ কাটত এই ভাবে। এই বয়স পর্যন্ত যা লেখালেখি করেছি, তার দৌলতে সাহিত্যের জগতে খুব একটা আনাগোনা ছিল না।  অর্থাৎ কলেজ স্ট্রীটে যাতায়াত বিশেষ ছিল না। কর্মজগতে প্রবেশের পরে লেখালেখি একটু বাড়ে। তার সাথে বইপাড়ায় যাতায়াতও বাড়ে। তখন সাগ্রহে শুনতাম, বড় বড় প্রকাশকরা কেমন আড়ম্বরের সঙ্গে নববর্ষের আড্ডা বসায়। ফেসবুক তখনও খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি এবং অন্যান্য সামাজিক গণমাধ্যম যেমন মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপও মানুষের কাছে খুব একটা প্রিয় হয়ে ওঠেনি। মেসেজের এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না। নববর্ষ পালন হেতু অল্পবিস্তর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত হত। 

সব মিলিয়ে নববর্ষ নিয়ে খুব একটা উন্মাদনা বা জাঁকজমক কোনটাই ছিল না। এখনও হয়ত তাই। বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে নববর্ষ এমন একটা ভিন্ন সুরে বাঁধা আছে, যে এই নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন দিনও ছিল না। অন্তত আমার চোখে সেরকম কিছু পড়েনি।

যত দিন ধরে লেখালেখি করছি, তার মধ্যে এক বছর, মনে আছে, বেশ পরিকল্পনা করে কলেজ স্ট্রীট বইপাড়ায় দিনের বেলা কাটিয়েছিলাম। সেবার সঙ্গে আমার স্ত্রীও ছিলেন। সেদিন সব ঘোরাঘুরির শেষে বাড়ি ফেরার আগে আদি মোহিনীমোহন বস্ত্রালয় থেকে স্ত্রীকে একটা শাড়িও কিনে দিয়েছিলাম। 

আনন্দ পাবলিশার্সের কাউন্টারেও গিয়েছিলাম। আনন্দ পাবলিশার্সের কাউন্টারে তখন বই দেখছিলেন কবি পিনাকী ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন কবি শিবাশিস মুখোপাধ্যায়। বাড়িতে  পিনাকী ঠাকুরের 'চুম্বনের ক্ষত' আমার সংগ্রহে ছিল। সে বইটি পড়েছি বহু বার। এর মধ্যে পিনাকী ঠাকুরের সঙ্গে কবিতা পাঠের আসরে কয়েক বার দেখা হয়েছে। তাছাড়া মানুষটি ছিলেনও খুব মিশুকে। বাস, জমে গেল তিনজনের। বেশ খানিকটা গল্পগুজবের পরে ছাড়াছাড়ি হল। 

আনন্দ পাবলিশার্সের কাউন্টারে গিয়েছিলাম সন্ধে নাগাদ। তার আগে অবশ্য দুপুরে অনেকটা সময় ছিলাম  পত্রভারতীর কলেজ রো কাউন্টারে। সেখানে তখন তারকার মেলা। কিন্নর রায় এসেছিলেন পাক্কা বাঙালির সাজে। পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবি। টেবিলে দু-তিন রকমের মিস্টির প্লেট। চুমকি চট্টোপাধ্যায় সবাইকে আপ্যায়ন করছেন। সে এক দারুণ দৃশ্য। আমি থাকতে থাকতে বিনোদ ঘোষাল এলেন। একটু পরে এলেন অনীশ দেব, হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত  এবং আরও অনেকে।

সত্যি কথা বলতে গেলে, অত তারকার মধ্যে নিজেকে কেমন অপ্রতিভ লাগছিল। সেটা অবশ্য মনে মনে। বাইরে থেকে কারও কিছু বোঝার উপায় নেই।  ওই কলেজ রো-তে সে সময় কবি শ্যামলকান্তি দাশ এবং কবি শংকর চক্রবর্তীর আকর্ষণে প্রকাশনা সংস্থা 'পাঠক' -এর অফিসেও যাতায়াত ছিল। পত্র ভারতীর কাউন্টার থেকে বেরিয়ে পাঠক-এর অফিসে ঘুরে এলাম। সেখানেও তখন প্রচুর কবি-সাহিত্যিকের সমাবেশ। 

মোটামুটি এই কয়েকটি মোলাকাত আমার বেশ মনে আছে। আরও কিছু কিছু প্রকাশকের অফিসে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, বলে রাখি। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স এবং দে'জ পাবলিশিং আমার কাছে বরাবর বেশ গুরুগম্ভীর স্থান বলে  মনে হয়। এখনও আমি মনে মনে সেই ধারণা পোষণ করি। তাই ইচ্ছে থাকলেও ওই দুই জায়গায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি। 

নববর্ষ নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে পুরানো কথা কিছু লিখে ফেললাম। বন্ধুরা ভাল থাকবেন। কথা হবে আবার।  আমার এই ব্লগ সাইট আপনাদের ভাল লাগলে, আমার প্রচেষ্টা সার্থক।



Thursday, April 14, 2022

ঘুগনি, এক নিত্যযাত্রীর চোখে...


অনেক দিন হল ট্রেনে চড়ছি। দেখেছি অনেক কিছু। বহু বছর ধরে ট্রেন সফরের খুব সামান্য একটি ঘটনা নিয়ে লিখেছিলাম এই গল্প। প্রকাশিত হয়েছিল দ্বান্দ্বিক পত্রিকার ১৪২৭ উৎসব সংখ্যায়।

খাদ্য রূপে ঘুগনি বাঙালির কাছে সেরকম বিশেষ কিছু নয়। হ্যাঁ, হতে পারে খুব পছন্দের। তবে কৌলীন্যে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। অফিস টাইম বাদ দিলে অন্য সময় ঘুগনিওয়ালাদের দেখা মেলে। তবে লক্ষ্য করেছি, একটু পরিপাটি করে জামাকাপড় পরা বাবুদের এরা এড়িয়ে চলে। আমার ধারণা, এড়িয়ে চলে ব্যবসার কারণে। এই শ্রেণির যাত্রীদের মধ্যে ঘুগনি খাওয়ার প্রবণতা খুব বেশি থাকে না।

তাহলে কোথায় এই ঘুগনিওয়ালাদের বেশি দেখা যায়?  এদের খুব বেশি দেখা যায় ভেন্ডর কামরায়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, কিছু ঘুগনি-বিক্রেতা আছেন যাঁরা ভেন্ডর কামরায় বেচাকেনা সেরে প্রয়োজনে কোন স্টেশনে নেমে যান। তারপর কিন্তু এদের অন্য কামরাতে, ঘুগনি বিক্রি করতে দেখা যায় না। তার থেকে এদের বরং বেশি পছন্দ পরের ট্রেনের ভেন্ডর কামরা।

এদের কেউ কেউ মুড়িতে মাখিয়ে ঘুগনি বেচে। সঙ্গে পেঁয়াজ, শসা কুচি, লংকার টুকরো আর সামান্য বিট লবণ। কখনও কখনও একটু পাতিলেবুর রসও ছড়িয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ শুধু ঘুগনি বেচেন। সঙ্গে কেউ চাইলে বাড়িয়ে দেন কোয়ার্টার পাউণ্ড পাঁউরুটি। 

আমার গল্পে যে ঘুগনিওয়ালা রয়েছেন, তিনি বৃদ্ধ। ওপর এবং নীচের পাটির বেশ কয়েকটি দাঁত পড়ে গেছে। কথা বলতে গেলে দুই গালে টোল পড়ে যায়। অবশ্য তিনি কথাও কম বলেন।  তাঁর আর একটি বিশেষত্ব আছে। তিনি সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরেন।  কথা কম বলেন।

অফিস টাইমে হাওড়ামুখী ডাউন লোকালে ঘুগনির খদ্দের থাকে না। সেই সময়টা তিনি কামরায় বসে লোকজনের সঙ্গে তাস খেলে কাটান।  তারপর ট্রেন হাওড়ায় পৌঁছালে তাঁকে বাদ দিয়ে সবাই নেমে যায়। তিনি আবার কোন এক আপ লোকালে উঠে ঘুগনি বিক্রি করেন।

করোনার পরে তাঁকে আমি অনেক দিন দেখিনি।  তবে তাঁকে আমি ভুলিনি। এখনও আমার দৈনন্দিন ট্রেন যাত্রায় কখনও ঘুগনিওয়ালা চোখে পড়লে, তাঁর কথা মনে পড়ে যায়। ইচ্ছে করে জানতে, তিনি আছেন কেমন? 

ট্রেনের সফর এক অদ্ভুত যাত্রা। এ যেন আগে থেকে ঠিক করা থাকে, সামান্য় একটু সময়ের জন্য় মানুষে মানুষে দেখা হবে। তারপর কে কোথায়, কারও কাছে তার খবর থাকবে না। কেউ যদি তাঁর খবর পান, জানাবেন আমাকে। আর অবশ্যই পড়বেন গল্পটি। আগামী দিনে নিশ্চয় আমার কোন গল্প সংকলনে গল্পটি গ্রন্থিত হবে। তখন জানাবো সে কথা। ভাল থাকবেন বন্ধুরা।